কলগার্ল
--------
রাজীব উল আহসান
------
আমার কাঁধ থেকে শাড়ির আঁচলটা পিছলে পড়ে গেল। দেখে মনে হবে অসাবধানতার কারনে পড়ে গেছে। আসলে তা নয়। আমি নিজে ইচ্ছে করেই ফেলে দিলাম। পরক্ষনেই আবার লজ্জা পাবার ভঙ্গীতে সামলেও নিতে চাইলাম। সবার চোখ আমার দিকে আটকে গেল। আমার লজ্জাবনত চোখের দিকে তাকিয়ে সবাই যে লজ্জা পেল, তা না! বরং কি যেন এক মাদকতা ছুঁয়ে গেল তাদের আবিষ্ট চোখেমুখে।
আজ আমি একটা পার্টিতে এসেছি। নামকরা একটা হোটেলের বলরুমে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে এসেছি ব্যবসায়ী সালেহীন সাহেবের সাথে। তার বয়স পঞ্চাশ এর ঘরে হবে হয়তো। কিম্বা তার'চে কিছুটা বেশি হতে পারে। কিন্তু মাথাভর্তি কাঁচাপাকা চুলের সাথে রিমলেস চশমার সালেহীন সাহেবের বয়স যেন চল্লিশের ঘরেই আটকে আছে। তিনি সদ্য বিপত্নীক। স্ত্রী শোক কাটিয়ে তারুন্যের অনুপ্রাসে নতুন করে সাজিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। আমাকেও সেভাবেই গাইড করা হয়েছে। তাই প্রথম থেকেই আমি সালেহীন সাহেবের গা লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছি। ড্রিংসের গ্লাস নিয়ে বারবার ঢলে পড়ছি ওর গায়ের উপর। পার্টি এখনো শুরু হয় নি। জানি না কতক্ষণ ধরে এই ঢং করতে হবে। তবে এসব করতে আমার মন্দ লাগছে না খুব একটা। সালেহীন সাহেব প্রথম দিকে কিছুটা আড়ষ্ট থাকলেও এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছেন।
আজ আমি গাঢ় পিংক কালারের ফিনফিনে শিফন শাড়ি পড়েছি। এ ধরনের পার্টিতে আমি সাধারণত আঁটোসাটো টপস আর জিন্স পড়ি। কিন্তু আজ ক্লায়েন্টের ইচ্ছেতেই শাড়ি পড়েছি। শাড়িটা তিনিই পাঠিয়ে দিয়েছেন। মনে হয় শাড়িতে ভালোই মানিয়েছে আমাকে। সবাই কেমন ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বুড়ো বিজনেস আইকনদের এই দৃষ্টি খুব এনজয় করছি আজ। তবে সালেহীন সাহেব মনে হয় লজ্জা পাচ্ছিলেন। তাই কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন। সালেহীন সরে যেতেই আমি কান্ডটা করলাম। বুড়োদের আকর্ষণ আরো বাড়াতেই আঁচলটা বুক থেকে ফেলে দিলাম।
এটা আমার একটা টেকনিক। আমার মত কলগার্লদের কিছু কিছু টেকনিক এপ্লাই করতে হয়। না হলে তীব্র কম্পিটিশনে কাস্টমার ধরে রাখা দায়!
আমার শাড়ির আঁচল পরে যেতেই কেও একজন হেল্প করার জন্য এগিয়ে এল। ভরাট পুরুষালি কন্ঠে বললো,
- 'এক্সকিউজ মি। আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি'?
পার্টির নীলচে মৃদু আলোতে আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। বুঝলাম উনি মিস্টার সালেহীন না। ভদ্রলোকের বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। কালো কোর্ট প্যান্টের সাথে কনট্রাস্ট করা লাল টাই ঝুলছে। আমি আহ্লাদি কন্ঠে বললাম,
- ' সিউর। হেল্প মি প্লিজ। আসলে আমার শাড়ি আটকানোর ব্রুশ পিনটা কিভাবে যেন নিচে পড়ে গেল! এখন খুঁজে পাচ্ছি না। হঠাৎ কিভাবে যেন খুলে গেল পিনটা'!
লোকটা বললো, 'একটু অপেক্ষা করুন। খুঁজে বের করছি'।
ধবধবে সাদা মার্বেল পাথরের মেঝের উপর লোকটা উবু হয়ে বসে গেলেন। কালো পোষাকে লোকটাকে কালো কাঁকড়ার মত দেখাচ্ছে। কাঁকড়ার মত হাত পা ছড়িয়ে ব্রুসপিনটা খুঁজছেন তিনি। আমি সেখান থেকে চোখ সরিয়ে আঁচলটা বুকে তুলে নিলাম। এতক্ষণ পর সবার চোখের পলক পড়লো। আমার কালো ভেলবেটের স্লিভলেস ব্লাউজে ঢাকা বুকের উপর ওদের চোখ আটকে ছিল। আমি মুচকি হেসে আঁচলটা তুলে নিয়ে আবার বুকে লেপ্টে নিলাম। তখনি মেঝে থেকে লোকটি উঠে দাঁড়ালো,
- 'এই যে আপনার ব্রুস পিন'।
আমার চোখের সামনে ধরা নকল রুবি বসানো ব্রুস পিনটা জ্বলজ্বল করছিল তখন।
'থ্যংক্স আপনাকে'।
'ইটস ওকে'।
ব্রুসপিনটার দিকে তাকিয়ে আনত কন্ঠে বললাম,
- 'ক্যান ইউ হেল্প মি এগেইন'? আর হাত ইশারায় ব্রুস পিনটা শাড়িতে আটকে দিতে বললাম। মুখে লাগিয়ে রাখলাম তেলতেলে আর্টফিশিয়াল হাসি, যে হাসির অর্থ হলো পিনটা লাগিয়ে দিলে খুব উপকার হয় আমার।
লোকটাও হতাশ করলো না। বললো, 'ইয়েস, হোয়াই নট? দিন, এক্ষুনি লাগিয়ে দিচ্ছি'।
তিনি কিছুটা সামনে ঝুকে এসে পিনটা শাড়ির সাথে সেট করে দিলেন। এর ফাঁকে আমার উন্মুক্ত পিঠে অনাবশ্যক ছোঁয়া দিতেও ভুললেন না তিনি।
আমিও হাসিমুখে তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম। হাত মেলাতে মেলাতে ভদ্রলোক বললেন, 'আমি আহমেদ শফিক'। আপনার পরিচয়টা পেলাম না মিসেস....?
'আমি শ্রেয়া। মিস্টার সালেহীন সাহেবের সাথে এসেছি'।
'সালেহীন সাহেব? বুড়ো লম্পটটা আপনার কি হয়? বয়ফ্রেন্ড'?
'আরে না না না'। আমি হাসতে থাকি খিলখিল করে। পার্টির লো ভলিউমের মিউজিকের সাথে আমার হাসি খুব মানিয়ে যায়।
লোকটা আবার বলে, 'তাহলে কি আপনি লম্পটটার নতুন স্ত্রী'?
'জী। ঠিক বলেছেন। তবে শুধু আজ রাতের জন্য। হি হি হি হি'।
আমার কথায় ভদ্রলোক খুব একটা ধাক্কা খেলেন তেমন নয়। তবে আমাকে আবার ভালো করে দেখলেন। গল্প করতে করতে আমরা ড্রিংক্স কর্নারে চলে এলাম।
এতক্ষণ আবছা অন্ধকারে লোকটিকে পরিচিত মনে হলেও চিনতে পারি নি। কিন্তু আলোতে এসে দুজনেই চমকে গেলাম। আমি শুধু মুখে বললাম,
- তুমি?
সে কিছু বললো না। কিম্বা বলতে পারলো না। আমি বললাম, 'নামটাই তাহলে পাল্টিয়ে নিয়েছো? শিপন থেকে আহমেদ শফিক'?
'তুমিও তো নাম পাল্টিয়েছো'?
আমি হাসি হি হি হি। মনে মনে বলি, যার জীবনটাই পাল্টে গেল তার আর নাম দিয়ে কি হবে?
শিপনের সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে কোনদিন কল্পনাও করি নি। বারো- চৌদ্দ বছর পর দেখা। যদিও এ দেখা না দেখার এখন কোন মানে নেই আমার কাছে। তাই আমার মনে শিপন তথা আহমেদ শফিক এতটুকু দাগ কাটলো না। অথচ এই লোকটার হাত ধরেই পালিয়ে ছিলাম আমি!
শিপন ভাই আমার এলাকার ছেলে। আমরা মফস্বলে পাশাপাশি গ্রামেই থাকতাম। সেই সূত্রেই পরিচয়। পরিচয় থেকে পরিণয়।
তখন কতই বা বয়স আমার। সবে ক্লাস নাইনে উঠেছি। দারুন ছাত্রী আমি। ক্লাসে সবসময় প্রথম ছিলাম। ইংরেজি গ্রামারের জটিল নেরেশনগুলো আমার মত শুদ্ধকরে কেও করতে পারতো না। কিম্বা উচ্চতর গনিতের জটিল উপপাদ্যগুলো এক নিমিষেই সলভ করে দিতাম। কিন্তু জীবনের সহজ পাটিগণিতের যোগ বিয়োগে কিভাবে যেন তালগোল পাকিয়ে ফেললাম।
পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত আমি কিভাবে যেন শিপন ভাই এর প্রেমে পড়ে গেলাম। অবশ্য না পড়ার কোন কারণ ছিল না। শিপন ভাই সুদর্শন, হ্যান্ডসাম। ঢাকায় বড় ব্যবসা করেন। মাঝেমাঝে এলাকায় গাড়ি নিয়ে আসেন। আবার ঢাকায় চলে যান। সবার মুখেমুখে কত নামডাক তার!
যদিও শিপন ভায়ের বয়স আমার চেয়ে একটু বেশি। একটু বলতে অনেকটাই বেশি। প্রায় পনের বছর। এরকম একজন লোকের সাথে আমার প্রেম হবার কথা না। কিন্তু কিভাবে যেন হয়ে গেল। আমিই যেন বেশি পাগল হয়ে গেলাম। আমার স্কুল ভালো লাগে না, পড়তে ভালো লাগে না, বড় বোনদের শাসন ভালো লাগে না। ভালো লাগে শুধু শিপন ভাইকে। কিন্তু সেই ভালোলাগার কথাও বাড়ির কাওকে বলি না। অত সাহস ছিল না আমার। আমি জানি, আব্বা জানলেও বিশ্বাস করবে না। আব্বার আদরের তুলতুলে ফুল কবে বদলে গেছে সে খবর আব্বা জানবে কিভাবে?
কিন্তু লোকে বলে না, ভীতু মানুষ ঝোঁকের মাথায় অনেক সাহসী কাজ করে ফেলে! আমিও একটা সাহসী কাজ করে ফেললাম। শিপন ভাই এর হাত ধরে এক সকালে পালিয়ে গেলাম।
শিপন ভাই আমাকে নিয়ে রওনা হলেন মৌলভীবাজার। আমাকে নিয়ে উঠলেন একটা রিসোর্টে। কি সুন্দর সবুজ-কোলাহল মুক্ত জায়গা। চারপাশে ছোটছোট টিলায় চা বাগান। চা বাগান দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। রিসোর্টটাও খুব সুন্দর আর নীরব।
একটা পাতা পড়ার শব্দও কানে আসে, এতটাই নিস্তব্ধ। কটেজের বাইরে চিড়িয়াখানা আছে। চিড়িয়াখানায় হরিণ আছে। কি সুন্দর মায়ামায়া চোখে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি অবশ্য যা দেখছিলাম তাতেই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, আরো আগে কেন পালালাম না!
আমার মুগ্ধতা কাটতে না কাটতেই সে বাইরে গেল। সাবান, শ্যাম্পু এটা-সেটা আরো কি কি যেন কিনতে হবে! আমি লজ্জায় লাল হয়ে বসে থাকি। বসে বসে মৌলভীবাজারের বৃষ্টি দেখি। কি সুন্দর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আমি আবার মুগ্ধ হলাম। আহা আরো আগে কেন পালালাম না!
আমার মুগ্ধতা কাটলো রাত দশটায়। তখন আমার আব্বার কথা মনে পড়লো। বড় তিন বোনের কথা মনে পড়লো। পড়ার টেবিলটার কথা মনে পড়লো। আর মায়ের কথা....
আমি ঝড়ঝড় করে কেঁদে চললাম। কিন্তু আমার কান্না-কথা শোনার মত কেউ ছিল না। আর এসব কথা কি বলা যায় কাউকে?
রাতে শিপন ফিরে এলো না। আমি খুব অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। তাহলে শিপনের কোন বিপদ হলো না তো?
কিছুক্ষন পর জানলাম বিপদ শিপনের হয় নি। বিপদ যা হবার আমার হয়েছে। শিপন আমাকে বিক্রি করে চলে গেছে। আমি বিক্রি হয়ে গেছি!
এরপর কি হলো! আত্নহত্যার চেষ্টা করলাম। পালাতে চেষ্টা করলাম। সম্ভব সব চেষ্টাই করলাম। শুধু একটি চেষ্টা ছাড়া।
বাড়িতে যোগাযোগের চেষ্টা। কখনো সেই চেষ্টা করি নি আমি। আজো না!
তবে আমার সব চেষ্টাই বিফলে চলে গেল। মাসখানেকের মত আমাকে কটজে আটকে রাখলো। প্রতিদিন একজন করে নতুন লোক আসতো আমার ঘরে। অচেনা সবাইকে আমার কাছে শিপন ভাই বলে মনে হতো। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে বলতাম, 'এত দেরি করলে কেন শিপন? সেই কখন থেকে বসে আছি আমি'!
ভদ্রলোকেরা আমার কথার উল্টো মানে খুঁজে নিত। আমিও যেন আস্তেআস্তে অভিযোগ- অনুযোগ সব ভুলে গেলাম।
এরপর মৌলভীবাজার থেকে আমাকে সিলেটে আনা হলো। এরপর সিলেট থেকে ঢাকা। ঢাকা থেকে চিটাগং। এ হাত থেকে সে হাত। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি।
এভাবে জীবন থেকে এতগুলো বছর চলে গেল। আমিও যেন সব কিছু ভুলে গেলাম। আমার জন্মই যেন এখানে হয়েছে! যেন আমার কোন মা ছিল না! আমার কোন বাবা ছিল না! ভাই বোন বলে কোনদিন কেউ ছিল না। আর শিপন ! এ নাম তো কবেই ভুলে গেছি আমি!
আমি এখন ব্যবসা বুঝি। আবেগ বুঝি'না। জীবিকা বুঝি, জীবন বুঝি'না!
তাই এত বছর পর শিপনকে দেখে চমকে উঠি ঠিকই, কিন্তু ধাক্কা খাই না।
আমি বললাম 'শিপন তুমি'?
'হুম আমি। আজকের পার্টি আমিই থ্রো করেছি। আজ আমার ছেলের জন্মদিন'।
আমাদের কথার মাঝে মাইকে এনাউন্স এলো, লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যান এক্ষুনি কেক কাটা হবে।
তখনি পুরো কক্ষ আলোকিত হয়ে গেল। দেখালাম বড় একটা কেকের সামনে একটা ছেলে আর একজন সুন্দরী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। বুঝলাম শিপন এর স্ত্রী - পুত্র তার জন্য অপেক্ষা করছে।
শিপন আমাকে একটা ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললো, তোমার নাম্বারটা দাও।
আমি আমার পার্স থেকে কার্ড বের করে দিলাম। আমার কার্ড হাতে নিয়ে বললো, 'কলগার্ল? ইউ আর এ কলগার্ল'?
মাইকে আবার এনাউন্স এলো। লেডিস এন্ড জেন্টেলমেন.......। শিপন আমার জবাবের প্রতীক্ষা না করে কেক কাটার জন্য চলে গেল।
শিপনকে দেখে আমার কেন যেন মন খারাপ হলো না! জানি না কেন! তাকে কেন যেন মোটেও দায়ী মনে হলো না। কোন রাগ, অভিমান, কষ্টবোধ আমাকে ছুঁয়ে গেল না। কেন গেল না কে জানে! হয়তো কলগার্লদের মন থাকতে নেই।
মনে মনে ভাবি, কি হবে এতদিনের খেরোখাতার হিসেব নিয়ে? ভালোই তো আছি!
তবে আমার এ ভাবনায় আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই।
মাস খানেক পর আরো আবাক করা এক কান্ড করে ফেললাম। শিপনকে একদিন কল করে বসলাম।
প্রথম দিকে শিপন কিছুটা আড়ষ্ট ছিল। কথায় কথায় সরি টরি বলে দুঃখ প্রকাশ করলো। কিন্তু আমার আস্কারায় আস্তে আস্তে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল। এরপর থেকে আমাদের যোগাযোগ হতো নিয়মিত।
এক বিকেলে শিপন এর ফোন এলো। আমাকে নিয়ে সিংগাপুর যেতে চায়। ওখানে ওদের ব্যবসার কি যেন কাজ আছে। সপ্তাহ দু'য়েক থাকবে সেখানে।
আমি শিপনকে না করে দিলাম। কেন যেন যেতে ইচ্ছে হলো না। তাছাড়া কদিন থেকে শরীরটাও ভালো যাচ্ছিলো না।
কিন্তু শিপন টিপ্পনি কেটে আমাকে উসকে দিল। আমি নাকি এখনো পেশাদার হয়ে উঠি নি! শিপন এর উস্কানি আমার গায়ে লাগলো। আমি নিজেই নিজেকে বোঝাই। টাকা নিয়ে কাজ করি আমি, তো শিপনের কাছ থেকে টাকা নিলে সমস্যা কোথায়? তবু কথা ঘুরিয়ে বলি, 'বউ বাচ্চা নিয়ে সিংগাপুর যাও। ঘুরে আসো।'
তাতিয়ে উঠে শিপন এর কন্ঠ, '
- "আরে, ওরা যাবে না। আমার মিসেসের উচ্চতাভীতি আছে। এরোপ্লেনে উঠতে পারে না। হি হি হি।"
- 'ওহ। তাহলে তো তোমার কপাল খারাপ বলতে হয়'!
- 'আরে না! একে কপাল খারাপ বলে না। কপাল ভালো বলে। বউ নিয়ে কি আর ট্যুর করা যায়?'
- 'মানে'?
- 'তোমার কাছে আর কি লুকাবো বলো? আসলে জীবনে এনজয়টাই মূল বিষয়। আমার বউ এসবের কিছুই বোঝে না। তাই..'!
- 'তাই কি'?
- 'তাই এই ট্যুরগুলোকে আমি আনন্দে ভরে তুলি। যতটা সম্ভব'।
- 'রিয়েলি'?
- 'হুম। তবে হয়েছে কি জানো! দেশের বাইরে সব আছে। তুমি যা চাইবে তাই পাবে। থাই সুন্দরী চাইলে থাই সুন্দরী পাবে, ইন্ডিয়ান চাইলে ইন্ডিয়ান পাবে। তবে এদের রোগ শোকের ঝুকি থাকে। তাই এই করো রে, সেই করো রে। এতে আসল আনন্দটাই নষ্ট হয়'।
- 'হিহিহি'
- 'আরে আমরা হলাম বাঙ্গালী পুরুষ। রোস্ট রেজালায় কি তৃপ্তি আসে? ভেতো বাঙ্গালী বলে কথা'।
- 'মানে'?
- 'মানে আর কি! আমার সাথে যাবে'?
- 'না না। আমি কেন'?
- 'তুমি এখনো সে সব কথা তাহলে ভুলতে পারো নি? আরে লাইফটাকে ইনজয় করো। তুমি তো এতদিনে মানিয়েও নিয়েছো'।
- 'তা নিয়েছি। এছাড়া আর উপায় কি বলো'?
- 'তবে তুমি কিন্তু আরো স্মার্ট হয়েছো। সেই কিশোরী থেকে এখন তোমার বয়সের কারনে সৌন্দর্য আরো বেড়েছে' ।
- 'তাই নাকি'?
- 'হুম। আমার মনে হচ্ছে ইস, এখন যদি তোমার সাথে আবার প্রেম করা যেত'?
- 'প্রেম করতে চাও'?
- 'হুম'।
- 'তাহলে তো করতেই পারো। সে জীবন তুমি আমাকে দিয়েছো তাতে প্রতিদিন প্রেম করতে আমি অভ্যস্ত হয়েছি'।
- 'যাবে আমার সাথে'?
- 'হাহাহা। তা কিভাবে হয়? আমার পাসপোর্ট ভিসা কিছুই তো নেই।'
- 'সেটা আমি করে নিব'।
- 'কিন্তু আমি একটু অসুস্থ ক'দিন থেকে'।
- 'বুঝেছি। ডিপ্লোমেটিক সিকনেস! তুমি আর আমাকে বিশ্বাস করছো না। ভাবছো যদি সেখানে তোমাকে বিক্রি করে দিয়ে আসি'?
- 'বিক্রি হবার ভয় আর নেই আমার। প্রতিদিন যে মানুষ বিক্রি হয়, তার আবার বিক্রি হবার ভয় কিসের'?
- 'তার মানে তুমি রাজি'?
- 'আমি একটু অসুস্থ, শরীরটা খুব দুর্বল, জ্বর জ্বর ভাব।'
- 'আর না করো না তো। আমি তাহলে টিকিট পাসপোর্টের ব্যবস্থা করি'?
- 'কিন্তু..'
- 'আর কিন্তু না। প্রয়োজনে তোমাকে সেখানে বড় হাসপাতালে ডাক্তার দেখাবো'।
- 'হাহাহা। চিকিৎসা করবো? এত টাকা কোথায় আমার'?
- 'টাকার চিন্তা করছো কেন? আমি দিব। তাতে আমার কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হলো'।
প্রায়শ্চিত্ত! শিপন এর কথায় আমি কিছুটা নরম হই। তাই তো! সিংগাপুর গেলে ভালো ডাক্তারও দেখানো যাবে। এ পেশায় শরীরটাই মুলধন। তাই শরীরের যত্নই সবার আগে। সবদিক বিবেচনা করে আমি সিংগাপুর যেতে রাজী হয়ে গেলাম। শিপন কদিনেই ম্যজিকের মত ভিসা পাসপোর্ট করে ফেললো।
দশ দিন পর এক সকালে আমরা সিংগাপুর পৌঁছলাম। শিপন এর সাথে আর আট দশ জন অফিসিয়াল। শিপন এর ইচ্ছেতেই আমরা আলাদা হোটেলে উঠলাম। শিপন একটা শর্ত দিলো। অন্যরা যেন কোনভাবেই বুঝতে না পারে আমি শিপন এর সাথে এসেছি!
শিপন তার বিজনেস মিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকলো দু'দিন।আমাকে শপিংয়ের জন্য টাকা দিল। একটা হাসপাতালের সাথেও ট্যাগ করে দিল। আমি সারাদিন ঘুরাফেরা করি, শপিং করি। পাশাপাশি আমার চিকিৎসাও চললো। সিংগাপুরে চিকিৎসা সেবা অন্যরকম। হোটেল থেকেই ওদের এজেন্ট আমাকে পিক করে নিয়ে গেল। ছেলেটার নাম পিটার। সোনালী চুলের উচ্ছ্বল যুবক। প্রথমদিন কিছু টেস্ট-ফেস্ট দিল। পরের দিন আরো কিছু টেস্ট। সব শেষে পিটার আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে গেল।
এভাবে দু'দিন চলে গেল। দু'দিন পর শিপন দু'দিনের জন্য প্লেজার টাইম পেল। বললো আমাকে নিয়ে আজ একটা আইল্যান্ডে যাবে। সেখানেই আজ আমরা থাকবো। সন্ধ্যা সাতটায় শিপন আমাকে হোটেল থেকে পিক করে নিল।
আইল্যান্ডের বীচটা খুব সুন্দর। বীচে একটা ভাসমান কটেজে আমরা রাত কাটাবো। খুব সুন্দর আলো ঝলমলে পরিবেশ। আশেপাশে অনেক সুন্দরী দেখতে পেলাম। শিপন আমাকে দেখিয়ে বললো এরাও তোমার মত কলগার্ল!
আমার মত? আমি কঠিন কি যেন বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। হালকা ভাবে বললাম,
- ' এত সুন্দর মেয়ে এরা। পুতুলের মত। এরা কেন এসব করে'?
- 'হা হা হা। এরা লাইফ এনজয় করতে জানে। তোমাদের মত না'!
শিপন এর কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। মদের নেশায় আরো বুদ হয়ে গেছে। আমারো কিছুটা নেশা নেশে লাগছে। নেশাতুর চোখে আমাকে কটেজের ভিতর নিয়ে এলো শিপন ।
শিপন নেশার ঝাঁঝেও আমার নাইটির ফিতা খুঁজে পেল ঠিকঠাক। এর পর নিতম্বের সাথে আটসাটো হয়ে থাকা শেষ সুটাতাও যখন খুলে নিল তখন অনেক রাত হয়েছে। সব শুনশান নীরব। সমুদ্রের ঢেউগুলো শো শো শব্দ করে কুলে আছড়ে পড়তে লাগলো।
এত বছর পর আমার বাসর হলো।এ কি স্বপ্নের বাসর? এ রকম একটা বাসরের কথা কতই না ভেবেছিলাম আমি।
দু'দিন খুব আনন্দে কাটলো আমাদের। শিপন যেন বেশি খুশি। আমাকে বললো,
পরের ট্যুরেও নাকি আমাকে আনবে!এখন থেকে সব ট্যুরেই আমাকে তার চাই!
সেদিন বিকেলের দিকে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। শিপন আমাকে আমার হোটেলে ড্রপ করতে এসেছে। হোটেলের লবিতেই পিটারের সাথে দেখা। পিটার হাসপাতাল থেকেই এসেছে বললো। আমকে দেখে সামনে এসে দাঁড়ালো। ইংরেজিতে বললো,
'শুভ সন্ধ্যা ম্যাডাম'।
- 'শুভ সন্ধ্যা'।
- 'আপনার রিপোর্টগুলো হাতে এসেছে'।
এই বলে, আমার দিকে রিপোর্টগুলো এগিয়ে দিল।
- 'কি আছে রিপোর্টে। ঠিকঠাক আছে তো সব? নাকি খারাপ কিছু?
- 'আমি দুঃখিত ম্যাডাম'।
- 'কি হয়েছে'? খারাপ কিছু?
শিপন আমার হাত থেকে রিপোর্ট গুলো ছোঁ'মেরে নিল। কাগজ উল্লাটে উল্লাটে বললো,
- এনিথিং রং মিস্টার...?
- 'ইয়েস'!
- 'এনিথিং ইস সিরিয়ায়'?
- 'ইয়েস'।
- 'প্লিজ টেল মি'।
- 'আই এম সরি। বাট শি ইজ এইচ আই ভি পজেটিভ!'
- 'হোয়াট? এইচ আই ভি'?
- 'ইয়েস। শি ইজ ইফেক্টেড বাই এইডস'!
- 'এইডস? হোয়াট'?
শিপন যেন পাগলা কুকুরের মত লাফাচ্ছে। দ্রুত রিপোর্টগুলো উল্টাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সিংগাপুরের সামুদ্রিক বাতাস এসে কাগজগুলো উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।
আমি হাসছি....
...হি হি হি। প্রথমে আস্তে আস্তে। এরপর আরো জোরে। আরো জোরে। হি হি হি।
আমার হাসি দেখে পিটার স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
শিপন এসে আমার চুলের মুঠি ধরলো। চুল যেন মাথা সুদ্ধ ছিঁড়ে যাবার যোগাড়। পাগলা কুকুরের মত ঘেউঘেউ করে উঠলো,
- ' তুই আগে থেকেই সব জানতি, তাই না'?
আমি শিপনের কথার উত্তর দিচ্ছি না। শুধু হেসেই যাচ্ছি।
হি হি হি।
শিপন আমার চুলের মুঠি ধরে আবোল তাবোল কী কী যেন বলেই যাচ্ছে। আমি আড়চোখে তার দিকে তাকাই। ওর নাকে ঘাম জমেছে।
নাকে ঘাম জমলে শিপনকে খুব সুন্দর দেখায়।
--------
লেখকঃ রাজীব উল আহসান
রচনাকালঃ ১১.৯.২০
1 Comments